Tuesday, 10 October 2017

বাউল তত্ত্ব কি?সংক্ষিপ্ত আলোচনা

সতেরো শতকের দ্বিতীয় পাদ থেকে বাউল মতের উদ্ভব ৷পনের ষোল শতকে 'ক্ষেপা'ও 'বাহ্যজ্ঞানহীন 'অর্থে বাউল শব্দ ব্যবহৃত হত ৷কেউ কেউ বলেন বাউল শব্দটা 'বাউর' বা এলোমেলো বিশৃঙ্খল, পাগল প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন ৷ তবে অধিকাংশের মতে 'বাতুল' শব্দ হতে বাউল নামের উদ্ভব ৷

বাউল গানের উপজীব্য মনের মানুষকে চিনতে না পারার হতাশা,গুরুর নিকট আত্মসমর্পণ, নিজের দৈনতা,সাধন -ভজন অক্ষম, জীবন,সমাজ ও পরিবেশ সচেতনতা ৷
মানব ধর্মতত্ত্ব, সেই ধর্মের সাধন-ভজন ও ক্রিয়াকলাপ হচ্ছে বাউল গানের মূল বিষয় ৷
বাউলদের পরম ও চরম সাধনা হচ্ছে খোদাকে চেনা ৷সক্রেটিস বলেছেন-"Know thyself"অর্থাৎ নিজেকে জানো ৷বেদের কথায় -"আত্মনং বিদ্ধি" অর্থাৎ নিজেকে জানো ৷হাদিসের কথায় -"মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু"অর্থাৎ নিজকে চিনলে রব(প্রভু) কে চেনা যায় ৷এ কথা স্পষ্ট যে,পরম আমাদের মধ্যেই আছেন ৷ আমাদের প্রত্যাশিত সাঁই আমাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছেন ৷অথচ আমরা নিজেকে চেনার চেষ্টা করি না, এটাই আমাদের চরম ব্যর্থতা ৷তাইতো লালন বলেছেন-
     "খুঁজি  তারে আসমান-জমি
    আমারে চিনি নে আমি
     একি বিষম ভুলে ভ্রমি"
জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ ৷জীবাত্মার মধ্যে পরমাত্মার অবস্থান ৷ তাই আপন আত্মার পরিশুদ্ধি ও পরিচয়ই  খোদার প্রাপ্তির উপায় ৷ আর আত্মার স্বরুপ উপলব্ধির সাধনাই বাউলদের ব্রত ৷
           "লামে আলিফ লুকায় যেমন
       মানুষে সাঁই আছেন তেমন"
অনেকে মনে করেন বাউল ও বৈষ্ণব এক ৷ বৈষ্ণবেরা একান্তভাবে প্রেমিক,প্রেম সাধক আর বাউলরা তাত্ত্বিক ৷ বাউলরা জীবন,সমাজ ও পরিবেশ সচেতন কিন্তু বৈষ্ণবরা পার্থিব জীবনে উদাসীন ৷
বাউলদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই ,তারা স্বশিক্ষিত ৷তাই তাদের লিখিত কোন শাস্ত্র নেই ৷বাউলরা স্বশিক্ষিত ও নিচু জাতের বলে সমাজের উচু স্তরে তাদের কোন কালে সম্মানিত হয়নি  ৷কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় ৷বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম বাউল মতের প্রতি শিক্ষিত মহলকে উৎসুক করে তোলেন ৷
বাউলরা ইশ্বর প্রেমে পাগল ৷ তারা সবকিছু ছেড়ে ইশ্বর বা পরমাত্মার দেখা পাওয়ার জন্য সাধনা করেন ৷ পার্থিব কোন কিছুর প্রতি তাদের কোন লোভ নেই ৷বর্তমান কালের সর্বাধিক জনপ্রিয় বাউল শাহ্ করিমকে সাবেক মন্ত্রী সুরণ্জিত সেন গুপ্ত বলেছিলেন পাক বাড়ী তৈরি করে দিবেন ৷ কিন্তু শাহ্ আব্দুল করিম তাকে বলেছিলেন যদি তিনি তাকে পাকা বাড়ী আর ধন সম্পত্তি দেন ৷ তাহলে তিনি আর বাউল শাহ্ আব্দুল করিম থাকবেন না ৷তাই তার এসবের প্রয়োজন নেই ৷এটা হলো বাউলদের পার্থিব উদাসীনতার ছোট্ট উদাহরণ মাত্র ৷
বাউল সাধকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক হলেন লালন ফকির ৷ এছাড়া প্রধান বাউল কবিরা হলেন মদন,পাগলা কানাই,ঈশান, গঙ্গারাম,রাধারমন দত্ত প্রমুখ ৷
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় বাউল কবিরা হলেন দূরবীন শাহ্,সীতালং শাহ্ ,রাধাবল্লব,রাজ্জাক দেওয়ান,মুজিব সরকার, বিজয় সরকার,ফকির জালালউদ্দিন খাঁ,ক্বারী আমির উদ্দিন, উকিল মুন্সি,চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ ৷

No comments:

Post a Comment